অসম্পূর্ণ নিঃশ্বাস

ইদানীং পুরানো একটি স্মৃতি বারবার মনে পড়ে। পুরান একটি মানুষ। আমার জীবনের একমাত্র মানুষ যে কিনা আমার বন্ধু নাহ, কখনো একটা দুইটার বেশি কথা হয়েছে কিনা তাও সন্দেহ, কিন্তু তার কথা আমার সবসময় মনে থাকে।

অপু!

সন্ধ্যার সাগরের মতো বিশাল মায়াবী চোখ আর ভেজা মাটির মতো গায়ের রং। আমি আজও সেই টলমলে চোখে নিজের চেহারা দেখতে পাই।

অনেক বছর আগের কথা, বছর বিশেক হবে। সন্তস স্যারের ক্লাস! কিছুক্ষন পরেই ছুটি! তাই স্যারের চেয়ে ছুটির ঘন্টার প্রতিই আমাদের বেশি মনযোগ। আমিও বইখাতা আগে থেকেই গুছিয়ে রেখেছি। আর মাত্র মিনিট চারেক বাকি! ছুটির হলেই দিব দৌড়!

ঘন্টা বাজার সাথে সাথে যেই দৌড় দেবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম তখন পিছনে ফিরে দেখি একটি ছোট জটলা। কাছে যেতেই রীতিমত আঁতকে উঠলাম। এইটুকু তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া ছেলেটি নিজের রক্ত দিয়ে খাতায় বিশাল বিশাল লম্বা লম্বা দাগ টানছে। কোন পাতায় একটি দুটি আবার কোন পাতায় অনেক গুলি। এভাবে একের পর এক সমস্ত খালি পাতাগুলো লাল রক্তের দাগে রঙিন হয়ে উঠছে।

আমি অপুকে বললাম, “কিরে, কি করছিস পাগলের মতো?”

অপু কোনো উত্তর দিল না, বরং আরও মনোযোগ দিয়ে খাতার নতুন নতুন পৃষ্ঠায় নিজের ইচ্ছেমতো লম্বা লম্বা রক্তের দাগ দিতে থাকল। অপু খুব চুপচাপ আর পিছনের সারির ছাত্র হওয়ায় আমাদের খুব বেশি কথা হত না। আমাদের ইউনিফর্ম ছিল সাদা হাফহাতা শার্ট আর নীল হাফপ্যান্ট! কিন্তু ওর শার্ট কখনোই সাদা মনে হতো না। সবসময় মাথায় চুপচুপিয়ে তেল দিয়ে আসত। তবে কালো বর্ণের এই ছেলেটির সবচেয়ে সুন্দর ছিল তার চোখ। তার বড় বড় চোখের মাঝে এক সাগর মায়া বাস করত।

আস্তে আস্তে অপুর এই রক্ত নিয়ে বাজে খেলাটি আমাদের কাছে বিরক্ত লাগতে শুরু করল। স্যার ক্লাস ছেড়ে চলে গেছে, নাহ হলে এই বিশাল পাকনামোর জন্য অপুর নামে এতক্ষণে নালিশ চলে যেত। অপুকে আমরা যত যাই বলছি অপুর কান অব্দি কিছুই যাচ্ছে নাহ। সে একের পর এক সাদা পাতা, তার কাটা আঙ্গুলের রক্ত দিয়ে এলোমেলো লাইট একেই যাচ্ছে। অনেকে বিরক্ত হয়ে খেলতে চলে যাচ্ছে! কেউ কেউ আবার ওর এই উদ্ভট কাজটি বিরক্ত সহকারে দেখছে। রনি তো বলেই ফেলল, “বস্তির পোলাপাইন কোথাকার! আমি এটা করলে আমার মা এক থাপ্পড়ে আমার সব দাঁত ফেলে দিত।”

অবশেষে কিছুক্ষন পরে ওর খাতার সবগুলো পাতা শেষ হল। আমরাও নাটকের পরবর্তী দৃশ্য দেখার জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে আছি! তখন সে কাউকে কিছু না বলে খাতাটি তার ব্যাগে ভরে, ক্লাস থেকে নীচুমস্তকে বের হয়ে গেল। আমাদের শত শত প্রশ্নের কোন জবাব পাওয়া গেল না। এমনকি সে আমাদের দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। ধীরে ধীরে একা একা হেটে গেট থেকে বের হয়ে গেল।

পরেরদিন সকালে আমরা ঠিক করলাম, আমরা অবশ্যই শাহীন স্যারকে অপুর এই বাজে কাজের জন্য নালিশ করব। কিন্তু অপু পরের দিন আর ইস্কুলেই আসল না। পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় আমাদের কিছুটা মন খারাপ হল। আমরা ধরে নিলাম একদিনতো একদিন আসবি!

কিন্তু অপুর বিরুদ্ধে আর সেই নালিশ করা হলো না। কারন অপুর দেখা আমরা আর কোনো দিনই পাইনি। কেউ কেউ বলে ওকে নাকি ময়লা টোকাইতে দেখছে, কেউ বলে ও নাকি হোটেলের থালা বাসন ধোয়ার কাজ করে কিন্তু আফসোস, আমার সাথে কখনো দেখা হল না! দেখা হলে নিশ্চয়ই ২-৪টা উপদেশ দিয়ে নিজেকে গর্বিত করতাম।

২০ বছর পর হঠাৎ হঠাৎ অপুর কথা খুব মনে পড়ে। বারবার অপুর সেই অর্থহীন সরু-লম্বা রক্তিম দাগগুলো অর্থবহ হয়ে ওঠে। মনে হয়, এমন একটি ভাষা যার কোনো সুর নেই, শব্দ নেই কিন্তু অর্থ আছে। যা বুঝতে আমার এতদিন লেগে গেল। মনে হয়, অপুকে পেলে একবার বুকে জড়িয়ে ধরে বলতাম, “বাবা, তোর মনের মধ্যে কী হচ্ছে আমাকে খুলে বল। এত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তুই কেন আর স্কুলে আসতে পারলি না? তোর এই এতটুকু বুকের মধ্যে এত কষ্ট কিভাবে চেপে রাখিস?” হ্যাঁ, ২০ বছরে আমি এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কিন্তু আমার মনের মধ্যে থাকা অপু এখনও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া ছোট্ট সেই শিশু। আমি যখন আমার সন্তানের বিভিন্ন চাওয়া পূরণ করতে পেরে তৃপ্তির হাসি দিই, তখন সেই হাসির কোনো এক বিন্দু আমাকে পরিহাস করে বলে, “অপুর সেই ছোট্ট চাওয়াই তো পূরণ করতে পারলি না।” হয়ত অপু অনেক আশা করে পড়াশোনা করার জন্য তার ছোট্ট সেই খাতাটি কিনেছিল, কিন্তু খাতাটি শেষ হবার আগেই, তার পড়াশোনা শেষ হয়ে গেল! তাই সে শেষের খালি পাতাগুলিতে সমাজের নিষ্ঠুরতার গল্প তার আপন শব্দহীন ভাষায় লিখে গিয়েছিল।

সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। কালো ভুনা আর খিচুড়ি খেতে খুব ইচ্ছা হল। তাই অনলাইনে অর্ডার দিলাম। আধা ঘণ্টা পর ডেলিভারি ম্যান খাবার নিয়ে দরজায় বেল দিল। দরজা খুলতেই মানুষটি আমার কাছে অতি পরিচিত লাগছিল। চেহারাটা কিছুটা মায়াবী! বৃষ্টিতে ভিজে কী যেন অপরাধ করে ফেলেছে এমন একটা লাজুক লাজুক ভাব।

আমি বললাম,
আপনি তো ভিজে গেছেন। ভিতরে আসেন? গামছা দেই?

না স্যার! আমার কিছু লাগবে না। ৭৩৪ টাকা হইছে।

তখন খাবার রেখে মানিব্যাগ থেকে টাকা আনার সময় মনে হল এই মানুষটি অনেকটা অপু মত। অপুর মত কাঁচা মাটির মত গায়ের রং, অপুর মতই চুপচাপ। আমি টাকাটা দিতে দিতে তাকে বললাম,

আপনার নাম কি?

মাজেদ

আমি কি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?

স্যার, আমার আরও এক জায়গায় খাবার দিয়া আসতে হইব! হেগো খাবার ঠান্ডা হইলে আবার রাগ করবে।

আমি জাস্ট ২ মিনিট নিব। এটা আমার থিসিসের জন্য খুব দরকার। প্লিজ, একটু ভিতরে আসুন!

আচ্ছা স্যার, বলেন!

আপনি ভিতরে আসুন?

না স্যার, ঠিক আছে! বলেন।

আপনি কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছেন?

ক্লাস টু।

আর পড়লেন না কেন?

গরিব তাই

(একদমই অতিরিক্ত কথা বলে না সে, একদম অপুর মতো)
একটু বিস্তারিত বলুন প্লিজ!

তা অনেক কাহিনী!

প্লিজ!

আচ্ছা শোনেন!! (অনেক কষ্টের পরও বিরক্ত ভাবটা আটকাতে পারল না)

আমার বাপ্ কাঠের মিলে কম করত! আমার যখন ৪ বৎসর বয়স তখন আমার বাপ মিলের করাত কাঠ কাটার সময় কাঠ উল্টি খাইয়া তার মাথায় পরে। এতেই শেষ। করাতে কাইটা কিন্তু মরে নাই, মরছে কাঠ মাথায় পইররা। তার অনেক নাকি শখ আছিল আমি পড়ালেখা করুম। হেরও মনেহয় আমার মত অশিক্ষিত হওয়ার দুঃখ আছিল! হা যাই হোক। হেরপর আমার মা মানসের বাড়ি কাম কইররা আমাগো খাওয়াইত। আমার একটা ছোডো বোন ও আছিল। কিন্তু বাপ মরার ৩ বছর পর মার রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়। এক মোটরসাইকেলের চাপায় তার ডান পা ভাইঙ্গা যায়। সাথে সাথে আমার কপাল দাও। ধার দেনা লইয়া কয়েক মাস চিকিৎসা করার পর আর পারলাম না। মা আমার লুলা হইয়া গেল। আমি তখন ইস্কুলের পর হাবিজাবি টোকাইয়া ১ বেলার মত ভাত আনতে পারতাম। তাও মায়ের আদা পেটও ভরত নাহ। আর তার ওষুধপাতি তো আগেই বাদ! একদিন মায়ে লাইত্থাইয়া ইস্কুলের বেরাম ছাড়াইল। তারপর আর যাইনাই। এসব আমাগো জন্য না। স্যার দেরী হইয়া যাইতাছে! আমি যাই!

জীবের এই নিষ্ঠুর কথা গুলি বলার সময় অপুর চোখে কোন পানি আসল নাহ! যদিও আমার চোখের পানি ধরে রাখা যাচ্ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল এই তো আমার বন্ধু অপু। অপু হেটে চলে যাচ্ছিল, আমি ওকে ডাক দিয়ে উচ্চসরে বললাম:

অপু?

স্যার আমার নামতো অপু না! আমি মাজেদ!

আমাদের চারপাশে হাজার হাজার অপু-মাজিদের বসবাস। সকল মাজিদই অপুর মত, সকল অপুও মাজিদের মতই। সময়-স্থানের ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু সবার স্বপ্নের কবরটা অনেকটাই একই রকম।

#শোহান আহমেদ সিজান
#১৬/০৫/২০২০